প্রায় শূন্য থেকে শুরু করে দীর্ঘ দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আর নিরলস সংগ্রামকে পুঁজি করে গড়ে তুলেছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন এবং প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিট। এবারের মূল রচনা আপনাকে পরিচয় করিয়ে দেবে নিরলস সংগ্রামি এবং দূরদর্শী চিকিৎসক সামন্তলাল সেনের সঙ্গে।

মানব সেবক ডাঃ সামন্তলাল সেন
নিমতলী। এ নামটি আজ আর স্রেফ কোনো ঠিকানা নয়। আগুনের লেলিহান শিখা, রাতের স্নিগ্ধ দিগন্তজুড়ে মৃত্যুদূতের লাল থাবা, একবুক শুদ্ধ বাতাসের জন্য মরণাপন্ন মানুষের গগনবিদারী আহাজারি আর প্রাণপ্রিয় স্বজনের জীবন্ত দগ্ধ হওয়ার দৃশ্য বুকে নিয়ে সবহারা মানুষের কলজে ছেঁড়া মাতমের আরেক নাম এখন নিমতলী। এত মৃত্যু, এত কান্না, এত বিষাদের মধ্যেও ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটের করিডরে নিমতলী শোকগাথার সাক্ষী বেঁচে যাওয়া অসহায় নিঃস্ব আহত মানুষগুলোর মৃত্যুভয়ে ভীত চোখে নতুনভাবে বেঁচে থাকার আশা জাগিয়ে তোলার চেষ্টায় সেবারত যেকোনো চিকিৎসক, সেবিকা কিংবা ওয়ার্ডবয়কে নিমতলীর কথা জিজ্ঞেস করলে একরাশ বেদনাহত অনুভূতির পর ভেসে উঠবে একটুকরো তৃপ্তি আর গর্বের হাসি। এ তৃপ্তি দুস্থ মানবতার সেবা করার, দেশের একমাত্র বার্ন ইউনিটের অংশ হতে পারার তৃপ্তি; এ গৌরবের একজন সামন্তলাল সেনের মতো নিঃস্বার্থ মানবসেবীর সাহচর্যে কাজ করতে পারার গৌরব।
‘বাবার বরাবরই শখ ছিল আমাকে ডাক্তারি পড়াবেন। বাবার চাকরিসূত্রে দিনাজপুরে থাকাকালীন স্কুল-কলেজের পাট চুকিয়ে ভর্তি হই চট্টগ্রাম মেডিকেলে। তারপর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে যোগ দিই। সেখানে আমার পরিচয় হয় পঙ্গু হাসপাতালের রূপকার ডা. গার্স্টের সঙ্গে। প্রথম দিনই তিনি আমাকে বললেন প্লাস্টিক সার্জারিতে কাজ করার জন্য। এক মুহূর্ত দ্বিধা না করে আমিও রাজি হয়ে গেলাম।’ ক্যারিয়ারের শুরুর কথা বলছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন এবং প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের অন্যতম স্বপ্নদ্রষ্টা, রূপকার ও বর্তমান প্রকল্প পরিচালক ডা. সামন্তলাল সেন।
১৯৪৯ সালে সিলেটের বিশ্বনাথে ওসমানীনগর গ্রামে এক মধ্যবিত্ত সাধারণ পরিবারে জন্ম এই প্রথিতযশা চিকিৎসকের। নিজের পরিবার সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার বাবা জিতেন্দ্রলাল সেন ছিলেন সামান্য সরকারি চাকুরে। মা ছায়া সেন অতি সাধারণ একজন গৃহিণী। কিন্তু আমার কাছে তাঁরা দুজনই ছিলেন অসাধারণ ব্যক্তিত্ব। অতি সাধারণ ঘরের ছেলেমেয়ে হয়েও আমরা পাঁচ ভাই, এক বোনের সবাই আজ নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত, শুধু তাঁদের দুজনের ত্যাগ ও দূরদৃষ্টির জন্য। দুজনই স্বর্গবাসী হলেও আমি এখনো তাঁদের দেখানো পথেই চলি। প্রতিদিন সকালে কাজে বের হওয়ার সময় মা-বাবার ছবিকে প্রণাম করে বের হই। মৃত্যুর মাসখানেক আগে মা আমাকে বলেছিলেন, ডাক্তার হিসেবে গরিব-দুঃখীর সেবা করাই যেন আমার জীবনের একমাত্র ব্রত হয়। তাহলেই তাঁর আত্মা শান্তি পাবে। মায়ের সে কথাকেই আমি আমার কাজের মূলমন্ত্র হিসেবে মানি। মা-বাবার আশীর্বাদই আমার সাফল্যের বড় সূত্র।’
১৯৮২ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজে যোগ দেওয়ার পরই মূলত পাল্টে যায় তাঁর জীবনদর্শন। শুরু হয় এক বৃহত্তর অর্জনের পথে নিরলস, নিঃস্বার্থ যাত্রা। ডা. সেন বলছিলেন সে সময়ের কথা, ‘স্বপ্ন ছিল বড় প্লাস্টিক সার্জন হব। মানুষের ঠোঁট, নাক, মুখের গড়ন ঠিক করব। কিন্তু এখানে এসে প্রথম অনুভব করলাম এসিডে পোড়া মেয়েদের কষ্ট, আগুনে পোড়া গরিব মানুষের দুর্দশা। এর মধ্যেই একবার আমার বড় মেয়ে অসুস্থ হলে ওর মুখে ছোটখাটো একটা দাগ হয়। ওর বয়স তখন ১০-১১। স্বাভাবিকভাবেই আমাকে একদিন দুঃখ করে বলল, কীভাবে এই দাগ যাবে। আমি তখন এসিডে পোড়া একটি মেয়ের ছবি ওকে দেখিয়ে বললাম, তোমার মুখের দাগ তো চলে যাবে, কিন্তু ভাবো, ওর কী দুঃখ। আমার মেয়ে তখন আমাকে বলে, যেন আমি এসব মেয়ের দুঃখ দূর করার জন্য কিছু করি। সেদিনই প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, আমার জীবন উৎসর্গ করব পোড়া রোগীদের সেবায়।
‘আমার বা আমার ছেলেমেয়েদের সাফল্যের পেছনে যার হাত সবচেয়ে বেশি, সে আমার সহধর্মিণী, রত্না সেন। এমবিএ করে নিজে চাকরি করেছে, পরিবার সামলেছে আর আমাকে দূরে রেখেছে পারিবারিক সব ঝামেলা থেকে। নইলে আমি যে চাকরি করতাম, তা করে পরিবার সামলে আবার এত বড় একটা কাজে সময় দেওয়া, সফল হওয়া ছিল অসম্ভব। ঢাকা মেডিকেল কলেজে স্বতন্ত্র বার্ন ইউনিট প্রতিষ্ঠার পথ মোটেই সহজ কাজ ছিল না।’ ডা. সেন বলছিলেন সেই সময়ের প্রতিকূলতার কথা, ‘আমার সঙ্গে তখন আরও ছিলেন দেশের প্রথম প্লাস্টিক সার্জন মোহাম্মদ শহিদুল্লাহ ও কবিরউদ্দীন আহমেদ। ঢাকা মেডিকেলের একটি ওয়ার্ডে মাত্র আটটি বিছানা ছিল আমাদের জন্য বরাদ্দ, যা প্রয়োজনের তুলনায় অতি নগণ্য। আমরা তিনজনই ঠিক করলাম, আগুনে পোড়া রোগীদের জন্য স্বতন্ত্র কিছু করতে হবে। ১৯৮৬ সালে সরকারের কাছে আবেদন করলাম আলাদা বিভাগ করার অনুমতি ও জায়গা চেয়ে। অনুমতি পেলাম, জায়গাও পেলাম, কিন্তু গোল বাধল জায়গা দখল নিয়ে। এখন যেখানে আমাদের ভবনটি দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে ছিল চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের থাকার জন্য শতাধিক ঘর। প্রায় প্রতিদিন আমাকে টেলিফোনে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হতো, যাতে এই প্রকল্প থেকে আমি সরে আসি। তখনই আমাকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসেন কর্মচারী সমিতির সভাপতি কালাম সরদার ও অন্যরা। আওয়ামী লীগের শেখ সেলিম সাহেবও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন এ ব্যাপারে। ১৯৯৩ সালে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে তবে যাত্রা শুরু করে আমাদের এই স্বতন্ত্র ইউনিট।’
নিমতলী দুর্ঘটনার রাতের সেই ভয়াল স্মৃতি এখনো যেন ক্ষত হয়ে আছে ডা. সেনের হূদয়ে। সে স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে কিছুটা যেন থমকে যান তিনি। সামলে নিয়ে বলেন, ‘নিমতলীতে আগুন লাগার খবর পাই আমি রাত নয়টার দিকে। প্রথমে অবস্থার ভয়াবহতা বোঝা না গেলেও অল্প সময়ের মধ্যেই যখন খবর পেলাম অবস্থা খারাপ। আমি নিজে রওনা হয়ে যাই। যাওয়ার পথে সম্ভাব্য সবার সঙ্গে যোগাযোগ করে দ্রুত ইউনিটে আসতে বলি। হাসপাতালে পৌঁছে প্রথমে চোখে পড়ে সারিবদ্ধ লাশ। একটু এগিয়ে যেতেই দেখলাম, চারদিকে শুধু যন্ত্রণাকাতর আগুনে ঝলসানো মানুষ। বয়স্ক পুরুষ-নারী, শিশু—কে নেই আহতদের মধ্যে! একের পর এক আহতদের নিয়ে আসা হচ্ছিল তখনো। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, আমার ৪০ বছরের চাকরিজীবনে এত পোড়া রোগী দেখিনি কখনো। মুহূর্তের মধ্যে হাজার হাজার মানুষের চিৎকার, আহাজারি, আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠল চারপাশ। এ রকম দুর্যোগ সামাল দেওয়ার মতো জনবল, সুযোগ-সুবিধা, পূর্ব অভিজ্ঞতা কিছুই ছিল না আমাদের। কিন্তু তাই বলে বসে ছিল না কেউ; ক্যাজুয়ালটিসহ মেডিকেলের অন্য বিভাগের ডাক্তার, নার্স, ওয়ার্ডবয় এমনকি ছাত্রছাত্রীরা পর্যন্ত নিজেদের মতো করে যে যেভাবে পেরেছে আহতদের সেবা করেছে। অনেক নার্সকে দেখলাম, সাদা পোশাক ছাড়াই চলে এসেছে। ঢাকা মেডিকেলের এক ছাত্রী এসে জানতে চাইল কী করতে পারে সে। আমি বললাম, আহতদের চিকিৎসা দিতে না পারো, ট্রলি তো ঠেলতে পারো। সে তা-ই করল। এখনো ৫০ জন রোগীর চিকিৎসা সুবিধাসংবলিত হলেও আমরা ২৩১ জন পোড়া রোগীর চিকিৎসা দিচ্ছি, যার সবই সম্ভব হয়েছে এখানকার জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক থেকে শুরু করে ওয়ার্ডবয় পর্যন্ত সবার আন্তরিক প্রচেষ্টায়।’
প্রতিষ্ঠার এই ১৭ বছরে হাঁটি হাঁটি পা পা করে বার্ন ইউনিটের কর্মপরিধি বেড়েছে, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও আছে অনেক। ডা. সেন বলছিলেন, ‘শুধু যে আগুনে পোড়া রোগীর চিকিৎসা আমরা করি, তা কিন্তু নয়। আমাদের প্লাস্টিক সার্জনরা কাটা আঙুল লাগানোর মতো জটিল অপারেশনসহ ঠোঁটকাটা, তালুকাটা ইত্যাদি ধরনের অপারেশন করেন। এ ছাড়া আমাদের আরেকটি প্রকল্পের আওতায় আমরা ঢাকার বাইরে প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে বিনা মূল্যে ঠোঁটকাটা ও তালুকাটা বাচ্চাদের অপারেশন করে থাকি। নার্সের সংখ্যা বাড়ানো, তরুণ ডাক্তারদের জন্য স্পেশালিটি কোর্স চালু করা, এখানকার কর্মচারীদের রাজস্ব খাতে নিয়ে আসাসহ আরও বেশ কিছু সুপারিশ প্রক্রিয়াধীন আছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত উদ্যোগে এবারই আমাদের অতি প্রতীক্ষিত আইসিইউ চালু হয়েছে। আগুনে পোড়া রোগীদের পুনর্বাসনের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ আমাদের ইউনিট থেকেই নেওয়ার পরিকল্পনাও আছে।’
শুধু বার্ন ইউনিটেই সীমিত নয় তাঁর কর্মপরিধি। এসিডে পোড়া রোগীদের চিকিৎসার জন্য প্রত্যন্ত এলাকায় ছুটে যান প্রতিনিয়ত। অকাতরে কাজ করে চলেছেন এসিডদগ্ধদের পুনর্বাসন বা আত্মকর্মসংস্থানের পথ করে দেওয়ার জন্য। বলছিলেন, ‘এসিডদগ্ধ নারীদের জন্য প্রথম আলো সহায়ক তহবিল ও ট্রাস্টের সদস্য আমি। ঢাকা মেডিকেল কলেজ বার্ন ইউনিট প্রতিষ্ঠায় অনুদান দিয়ে সহায়তা করেছে প্রথম আলো।’
ডা. সেনের কাছ থেকে বিদায় নেব, এমন সময় দেখা হলো সেই কালাম সরদারের সঙ্গে। সময়ের পরিক্রমায় এখন তিনি ষাটোর্ধ্ব প্রৌঢ়। বললেন, ‘সেন স্যারের মতো ভালো মানুষ খুব নাই। শুধু স্যাররে পছন্দ করার কারণে এই বার্ন ইউনিটের জন্য ১৩৫টি ঘর ভাইঙা দিছিলাম। আজকে বুঝি, কত বড় একটা কাজ স্যার শুরু করছিলেন সেদিন। আর আমরা কত ভাগ্যবান যে এই কাজের সাথে ছিলাম। বার্ন ইউনিট মানেই সেন স্যার; সেন স্যার মানেই বার্ন ইউনিট।’
ডা. সেন মুচকি হাসলেন; বললেন, ‘আসলে এটা ঠিক; আমি নিজেও অনেক সময় আলাদা করতে পারি না আমাকে এটা থেকে। এই ইউনিটটিকে মনে হয় আমার সন্তানের মতো। আমার সব কাজ, মনোযোগের কেন্দ্র বার্ন ইউনিট। প্রতি রাতে বিছানায় যাওয়ার আগে যেমন আমি আমার ছেলেমেয়েদের দেখে আসি, তেমনি ইউনিটে ফোন না করে আমি ঘুমাতে পারি না। আমার বাচ্চাদের গায়ে একটা আঁচড় লাগলে আমার যেমন কষ্ট, তেমনি বার্ন ইউনিটের কোনো ক্ষতি হলে আমার ততটুকুই কষ্ট হয়।’
২০০১ সালে কালীগঞ্জে ঠোঁটকাটা একটি মেয়েবাচ্চার অপারেশন করেছিলেন ডা. সেন। ২০০৭ সালে আবার যখন সেখানে যান, খবর পেয়ে সেই মেয়েটি তাঁর সঙ্গে দেখা করতে চলে আসে স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে কৃতজ্ঞতা জানাতে। ‘যে বিদ্যা শিখেছি, তা দিয়ে চাইলে অনেক টাকা কামাতে পারতাম। কিন্তু সাদা অ্যাপ্রোনটা যখন গায়ে দিই, তখন সেই মেয়েটির শ্রদ্ধাবনত দৃষ্টি আর এসিড কিংবা আগুনে দগ্ধ অসহায় রোগীদের চোখের সেই বাঁচার আকুলতা আমাকে অর্থলোভী হতে দেয় না।’ ডা. সামন্তলাল সেন পথ চলতে চান এই সহজ-সুন্দর জীবনদর্শন নিয়েই।
কৃতজ্ঞতা: প্রথম আলো